যাকাতের বিধান, হিসাব করার নিয়ম, ফরজ হওয়ার শর্ত, এবং যাকাত প্রদানের উপযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা

 ঠিক আছে, আমি আপনাকে যাকাতের বিধান, হিসাব করার নিয়ম, ফরজ হওয়ার শর্ত, এবং যাকাত প্রদানের উপযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা—সব কিছু কুরআন ও সহিহ হাদিসের আরবি দলিলসহ হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিস্তারিতভাবে দিচ্ছি।


যাকাত: বিধান ও হিসাব করার নিয়ম

(কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)


১. যাকাতের সংজ্ঞা ও বিধান

সংজ্ঞা: “যাকাত” অর্থ বৃদ্ধি ও পবিত্রতা। ইসলামী শরীয়তে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের উপর নির্দিষ্ট সময় পর আল্লাহর জন্য নির্ধারিত হারে গরিব-মিসকিনদের মাঝে তা বণ্টন করা।

  • কুরআনের দলিল:
    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ
    (سورة البقرة: 43)
    অর্থ: “তোমরা নামাজ কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর।”

  • হাদিসের দলিল:
    عَنْ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:

"بُنِيَ الإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ ... وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ ..."
(صحيح البخاري، حديث 8)
অর্থ: “ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত... এবং যাকাত প্রদান করা তার একটি।”


২. যাকাত কখন ফরজ হয়? (শর্তসমূহ)

যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য হানাফি ফিকহ অনুযায়ী ৫টি শর্ত রয়েছে—

  1. মুসলমান হওয়া – অমুসলিমের উপর যাকাত ফরজ নয়।

  2. বালেগ হওয়া – প্রাপ্তবয়স্কের উপর ফরজ।

  3. আকিল হওয়া – মানসিকভাবে সুস্থ।

  4. নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া

    • স্বর্ণ: ৭.৫ তোলা (≈ 87.48 গ্রাম)

    • রৌপ্য: ৫২.৫ তোলা (≈ 612.36 গ্রাম)

    • অথবা স্বর্ণ/রৌপ্যের সমমূল্যের নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য ইত্যাদি।

  5. হাওলানুল হাওল (এক বছর পূর্ণ হওয়া) – সম্পদ নিসাব পরিমাণে পৌঁছানোর পর পূর্ণ এক চন্দ্রবর্ষ অতিক্রম করতে হবে।

  • হাদিসের দলিল:
    لَيْسَ فِي مَالٍ زَكَاةٌ حَتَّى يَحُولَ عَلَيْهِ الْحَوْلُ
    (سنن ابن ماجه، حديث 1792)
    অর্থ: “কোনো সম্পদের উপর যাকাত নেই, যতক্ষণ না তার উপর এক বছর অতিক্রম হয়।”


৩. যাকাতের হার ও হিসাব করার নিয়ম

হার:

  • সোনা, রূপা, নগদ টাকা, ব্যবসায়িক পণ্য, সঞ্চয় → মোট সম্পদের উপর ২.৫% (১/৪০ অংশ) যাকাত দিতে হবে।

হিসাবের নিয়ম (ধাপে ধাপে)

  1. আপনার কাছে যে সমস্ত সোনা, রূপা, নগদ অর্থ, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যবসার মালামাল, বাকি পাওনা টাকা আছে, সব মিলিয়ে যোগ করুন।

  2. যে ঋণ আপনি অন্যকে পরিশোধ করতে হবে (বর্তমান বছরের মধ্যে), তা বাদ দিন।

  3. অবশিষ্ট সম্পদ যদি নিসাব পরিমাণ বা তার বেশি হয় এবং এক বছর পূর্ণ হয়েছে → মোট অবশিষ্টের ২.৫% যাকাত দিন।

📌 উদাহরণ:
আপনার মোট সম্পদ = ৫,০০,০০০ টাকা
ঋণ (বর্তমান বছরের) = ৫০,০০০ টাকা
নেট সম্পদ = ৪,৫০,০০০ টাকা
যাকাত = ৪,৫০,০০০ × ২.৫% = ১১,২৫০ টাকা


৪. যাকাত কাদের দেওয়া যাবে?

কুরআনে ৮ শ্রেণির লোককে যাকাত প্রদানের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে—

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
(سورة التوبة: 60)

বাংলা অর্থ: “যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের মন ইসলামের দিকে আকর্ষণ করা প্রয়োজন, দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে, এবং মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ বিধান।”

৮ শ্রেণি:

  1. فقير – অত্যন্ত দরিদ্র, যাদের কিছুই নেই।

  2. مسكين – যাদের কিছু আছে কিন্তু নিসাব পরিমাণ নয়।

  3. العاملون عليها – যাকাত আদায়ের কর্মচারী।

  4. المؤلفة قلوبهم – নতুন মুসলিম বা ইসলামে আকৃষ্ট করার জন্য।

  5. في الرقاب – দাস মুক্ত করার জন্য।

  6. الغارمين – ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।

  7. في سبيل الله – আল্লাহর পথে (জিহাদ, দ্বীনের কাজ, দাওয়াহ ইত্যাদি)।

  8. ابن السبيل – পথিমধ্যে আটকে পড়া মুসাফির।


৫. যাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে না

  • ধনী ব্যক্তি (নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক)

  • নিজের পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, নানাভাই-নানিভাই

  • নিজের সন্তান-নাতি-নাতনি

  • অমুসলিম (যদি না নতুন মুসলিম করার উদ্দেশ্য হয়)

  • আল্লাহর পথে নির্মাণকাজে (মসজিদ, রাস্তাঘাট ইত্যাদিতে সরাসরি যাকাতের টাকা খরচ করা যাবে না)


৬. যাকাত না দেওয়ার পরিণতি

  • কুরআন:
    وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
    (سورة التوبة: 34)

অর্থ: “যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং আল্লাহর পথে খরচ করে না, তাদেরকে শাস্তির সংবাদ দাও।”

  • হাদিস:
    مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا، إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ، صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ...
    (صحيح مسلم، حديث 987)
    অর্থ: “যে ব্যক্তি সোনা-রূপার যাকাত আদায় করে না, কিয়ামতের দিনে তার জন্য আগুনের পাত বানানো হবে…”


আপনি চাইলে আমি এই যাকাতের হিসাব করার জন্য একটি প্রস্তুত বাংলা-ইংরেজি চার্ট ও ক্যালকুলেশন টেবিল তৈরি করে দিতে পারি, যা দেখে সহজে যাকাত নির্ধারণ করা যাবে।
আপনি কি চান আমি সেটা এখন বানিয়ে দিই?

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!