### হাইজ ও নেফাসের সংজ্ঞা, সময়সীমা ও বিস্তারিত আলোচনা (আরবী দলিলসহ)
#### ১. **হাইজ (حيض) বা ঋতুস্রাব**
**সংজ্ঞা**: হাইজ হলো মহিলাদের জরায়ু থেকে নির্গত স্বাভাবিক রক্তস্রাব, যা বয়ঃসন্ধিকাল থেকে শুরু হয়ে মেনোপজ পর্যন্ত মাসিক চক্রে প্রকাশ পায়। এটি সুস্থতা ও প্রজনন সক্ষমতার লক্ষণ।
**সময়সীমা**:
- **হানাফি মাযহাব**:
- **ন্যূনতম সময়**: ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা)।
- **সর্বোচ্চ সময়**: ১০ দিন ১০ রাত (২৪০ ঘণ্টা)।
- **পবিত্রতার ন্যূনতম সময়**: ১৫ দিন (যদি রক্ত ১০ দিনের আগে বন্ধ হয়)।
- **শাফেয়ী মাযহাব**:
- **ন্যূনতম সময়**: ১ দিন ও ১ রাত (২৪ ঘণ্টা)।
- **সর্বোচ্চ সময়**: ১৫ দিন।
- **মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব**:
- **ন্যূনতম সময়**: ১ দিন (২৪ ঘণ্টা)।
- **সর্বোচ্চ সময়**: ১৫ দিন।
**আরবী দলিল**:
- **কুরআন**:
- **সূরা আল-বাকারাহ ২:২২২**:
﴿وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ﴾
*"তারা আপনাকে হাইজ (ঋতুস্রাব) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, এটি অপবিত্রতা। অতএব, তোমরা হাইজের সময় স্ত্রীদের থেকে পৃথক থাকো।"*
- **হাদিস**:
- **সহিহ বুখারি ৩২০৬**:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ أَبِي حُبَيْشٍ كَانَتْ تُسْتَحَاضُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ دَمَ الْحَيْضَةِ أَسْوَدُ يُعْرَفُ، فَإِذَا كَانَ ذَلِكِ فَأَمْسِكِي عَنِ الصَّلَاةِ، فَإِذَا كَانَ الْآخَرُ فَتَوَضَّئِي وَصَلِّي».
*"ফাতিমা বিনতে আবি হুবাইশ ইস্তিহাযায় (অনিয়মিত রক্তস্রাবে) ভুগলে নবী (সা.) বললেন: হাইজের রক্ত কালো ও চেনা যায়। যখন তা দেখা দেবে, তখন নামাজ বন্ধ রাখো। আর যখন অন্য রক্ত (ইস্তিহাযা) দেখা দেবে, অজু করে নামাজ পড়ো।"*
---
#### ২. **নেফাস (نفاس) বা প্রসব-পরবর্তী রক্তস্রাব**
**সংজ্ঞা**: সন্তান প্রসবের পর জরায়ু থেকে নির্গত রক্ত। এটি সাধারণত ৪০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
**সময়সীমা**:
- **হানাফি মাযহাব**:
- **সর্বোচ্চ সময়**: ৪০ দিন। যদি রক্ত ৪০ দিনের আগে বন্ধ হয়, তবে তা নেফাসের সমাপ্তি।
- **ন্যূনতম সময়**: নির্দিষ্ট নেই; প্রসব-পরবর্তী যেকোনো রক্তই নেফাস।
- **শাফেয়ী মাযহাব**:
- **সর্বোচ্চ সময়**: ৬০ দিন।
- **মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব**:
- **সর্বোচ্চ সময়**: ৪০ দিন (হাম্বলি মতে ৪০ দিনের পর রক্ত ইস্তিহাযা গণ্য)।
**আরবী দলিল**:
- **হাদিস**:
- **সুনান আবু দাউদ ৩০৭**:
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: «كَانَتِ الْمَرْأَةُ تَجْلِسُ بَعْدَ النِّفَاسِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، فَكُنَّا لَا نَأْمُرُهَا بِقَضَاءِ الصَّلَاةِ».
*"উম্মে সালামা (রা.) বলেন: প্রসব-পরবর্তী মহিলা ৪০ দিন অপেক্ষা করতেন। আমরা তাদের নামাজ কাযা করতে বলতাম না।"*
---
#### ৩. **হাইজ ও নেফাসের অতিরিক্ত সময় (ইস্তিহাযা)**
- **সংজ্ঞা**: হাইজ বা নেফাসের সর্বোচ্চ সময় অতিক্রম করলে পরবর্তী রক্তস্রাব **ইস্তিহাযা** (অনিয়মিত রক্ত) গণ্য হয়। এ অবস্থায় মহিলা নামাজ-রোজা পালন করবেন এবং স্বাভাবিক ইবাদত করবেন (অজু করে)।
- **দলিল**:
- **সুনান ইবনে মাজাহ ৬২২**:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا أَقْبَلَتِ الْحَيْضَةُ فَدَعِي الصَّلَاةَ، وَإِذَا أَدْبَرَتْ فَاغْسِلِي عَنْكِ الدَّمَ وَصَلِّي».
*"যখন হাইজ শুরু হয়, তখন নামাজ ছেড়ে দাও। আর যখন তা শেষ হয়, রক্ত ধুয়ে নামাজ পড়ো।"*
---
#### ৪. **হুকুম ও প্রভাব**:
- হাইজ ও নেফাসের সময় মহিলাদের নামাজ, রোজা, কুরআন স্পর্শ ও মসজিদে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
- হাইজ শেষে **গোসল** ফরজ। নেফাস শেষেও গোসল আবশ্যক।
- রমজানের রোজা কাজা করতে হয়, কিন্তু নামাজ কাজা করতে হয় না।
**সর্বোচ্চ সময়ের দলিল**:
- **ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া (হানাফি)**:
- *"أقل الحيض ثلاثة أيام ولياليهن وأكثره عشرة أيام... وأقل النفاس لحظة وأكثره أربعون يوما"*
*"হাইজের ন্যূনতম তিন দিন ও রাত, সর্বোচ্চ দশ দিন... নেফাসের ন্যূনতম একটি মুহূর্ত, সর্বোচ্চ চল্লিশ দিন।"*
---
### উপসংহার:
হাইজ ও নেফাসের সময়সীমা মাযহাবভেদে ভিন্ন, তবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো হানাফি মতে হাইজ ৩-১০ দিন ও নেফাস ৪০ দিন। এ সময়ের অতিরিক্ত রক্ত ইস্তিহাযা, যা সাধারণ ইবাদতে বাধা নয়।

