ইসলামে ফটোগ্রাফি বা ছবি তোলার বিধান সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের মধ্যে বিভিন্ন মতপার্থক্য রয়েছে। এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর দলিল, ফিকহী মাসআলা এবং সমকালীন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
### **১. নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি ও দলিল:**
কিছু ঐতিহ্যবাদী আলেম ছবি তোলাকে হারাম মনে করেন। তাদের যুক্তি নিম্নরূপ:
- **হাদিসের নিষেধাজ্ঞা:**
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
**"যে ব্যক্তি ছবি তৈরি করবে, কিয়ামতের দিন তাকে তাতে প্রাণ সঞ্চার করতে বলা হবে, অথচ সে তা করতে পারবে না।"** (সহীহ বুখারী: ৫৬২৪)
অন্য বর্ণনায় আছে:
**"ছবি তৈরিকারীদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।"** (সহীহ মুসলিম: ২১০৯)
- **ফিকহী ব্যাখ্যা:**
প্রাচীন ফকিহগণ (ইমাম মালিক, শাফিঈ, আহমাদ প্রমুখ) যেকোনো প্রাণীর ছবি তৈরি করাকে নিষিদ্ধ বলেছেন, তা চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্য বা অন্য কোনো মাধ্যমেই হোক। তাদের মতে, ফটোগ্রাফিও এটির আধুনিক রূপ, যা "তাসবীর" (প্রাণীর ছবি তৈরি)-এর অন্তর্ভুক্ত।
---
### **২. অনুমতির পক্ষে যুক্তি ও শর্তাবলি:**
অনেক আধুনিক আলেম প্রযুক্তিগত বিবর্তন ও প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে ফটোগ্রাফিকে জায়েজ বলেছেন, তবে কিছু শর্তসাপেক্ষে:
- **প্রযুক্তিগত পার্থক্য:**
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে উথাইমীন (রহ.) প্রমুখ আলেমের মতে, ফটোগ্রাফি মূলত "আলো-ছায়া ধারণ", যা হাদিসে বর্ণিত হস্তনির্মিত ছবি (যেমন মূর্তি) থেকে ভিন্ন। এটি প্রকৃতির প্রতিফলন মাত্র, তাই হারাম নয়। (ফাতাওয়া নূর আলাদ দারব: ৩/৯৬৮)
- **প্রয়োজন ও কল্যাণ:**
ডকুমেন্ট, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা বা শরয়ী উদ্দেশ্যে ছবি তোলাকে অনেক আলেম জায়েজ বলেছেন। যেমন: পাসপোর্ট, শিক্ষামূলক ভিডিও ইত্যাদি। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, **"প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে নিষিদ্ধ বস্তুও অনুমোদিত হয়।"** (মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৯/৩৪৬)
- **অহংকার ও অপব্যবহার এড়ানো:**
ছবি যেন অহংকার, গুনাহ বা শিরকের মাধ্যম না হয়। যেমন: সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীলতা, মূর্তি পূজা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা।
- **প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ ছবি পরিহার:**
কিছু আলেম শুধুমাত্র প্রাণীর মুখ বা আংশিক ছবি গ্রহণে নমনীয়তা দেখান, যেমন শিশুদের স্মৃতি সংরক্ষণ। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রতিকৃতি তৈরি না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
---
### **৩. প্রধান ফিকহী মতামত সংক্ষেপে:**
- **হানাফি ও মালিকি মাযহাব:**
প্রয়োজনে স্থির ছবি (যেমন ডকুমেন্টেশন) জায়েজ, তবে প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ ছবি নিষেধ। (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৫৬)
- **শাফিঈ ও হাম্বলি মাযহাব:**
অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেকোনো প্রাণীর ছবি নিষিদ্ধ, তবে ডিজিটাল বা ফটোগ্রাফিকে কিছু আলেম ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। (আল-মুগনী: ৭/২৮৫)
- **সমকালীন ফতওয়া:**
সৌদি আরবের স্থায়ী কমিটি (ফতওয়া নং ১৭৮৭) এবং আল-আজহার কর্তৃক জরুরি প্রয়োজনে ফটোগ্রাফি অনুমোদিত।
---
### **৪. সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ:**
- **জায়েজ হওয়ার শর্তসমূহ:**
১. শরয়ী প্রয়োজন বা উপকারিতা থাকা।
২. অহংকার, গুনাহ বা শিরকমুক্ত উদ্দেশ্য।
৩. প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ ছবি এড়ানো (যদি সম্ভব হয়)।
৪. ছবি যেন পূজা বা শ্রদ্ধার 대상 না হয়।
- **মাকরূহ ক্ষেত্র:**
অপ্রয়োজনে সেলফি, শৌখিন ছবি বা প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করা মাকরূহ হিসেবে গণ্য।
---
### **৫. সর্বোত্তম পথ:**
যদি প্রয়োজন না থাকে, তবে ছবি তোলা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। তবে সামাজিক, পেশাগত বা শরয়ী প্রয়োজনে শর্তসাপেক্ষে তা জায়েজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
**"তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ো না।"** (সুরা আল-বাকারা: ১৯৫)
এবং
**"তোমরা অজ্ঞতায় কোনো বিষয়কে হারাম করো না।"** (সুরা আল-আনআম: ১৪৪)
**সর্বোপরি,** ব্যক্তিগত ইখলাস ও সতর্কতা অবলম্বন করে শরিয়তের গণ্ডিতে থেকে প্রয়োজন পূরণ করাই উত্তম।**
হানাফি মাযহাবের দৃষ্টিতে ফটোগ্রাফি বা ছবি তোলার বিধান সম্পর্কে বিশদ আলোচনা নিম্নে আরবী দলিলসহ উপস্থাপন করা হলো:
---
### **১. হানাফি ফিকহে প্রাণীর ছবি তৈরি হারাম:**
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফি ফকিহগণ প্রাণীর ছবি তৈরি (তাসবীর) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বলেছেন। এ সম্পর্কে কুরআন-হাদিস ও ফিকহী দলিল:
#### **ক. কুরআনের ইঙ্গিত:**
আল্লাহ বলেন:
**﴿وَیَصْنَعُ مَا لَا تَصْنَعُونَ﴾** (সূরা হাজ্জ: ৭৩)
এ আয়াতের তাফসিরে ইমাম কুরতুবী (রহ.) উল্লেখ করেন, "প্রাণীর সৃষ্টিতে আল্লাহর এককত্বের সাথে কাউকে শরীক করা হারাম।" (তাফসীরে কুরতুবী: ১২/৮৪)
#### **খ. হাদিসের সরাসরি নিষেধাজ্ঞা:**
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
**«إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ»**
**"কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ছবি তৈরি করা ব্যক্তিরা।"** (সহীহ বুখারী: ৫৬২৪, সহীহ মুসলিম: ২১০৯)
#### **গ. হানাফি ফকিহদের ব্যাখ্যা:**
- ইমাম সারাখসী (রহ.) লিখেন:
**"تَحْرِيمُ التَّصْوِيرِ لِلسَّبَبِ الَّذِي ذَكَرَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَهُوَ الْمُشَابَهَةُ بِخَلْقِ اللَّهِ تَعَالَى"**
**"প্রাণীর ছবি তৈরি নিষিদ্ধ, কারণ তা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য তৈরি করে।"** (আল-মাবসূত: ২৪/১৬)
- ইবনে আবিদীন (রহ.) তার **"রদ্দুল মুহতার"**-এ উল্লেখ করেন:
**"وَالصَّنَمُ مَا لَهُ ظِلٌّ، وَالتَّمْثَالُ مَا لَهُ جِسْمٌ بَارِزٌ، وَهُمَا حَرَامٌ"**
**"মূর্তি ও প্রাণীর প্রতিকৃতি (যার ছায়া বা আকার বিদ্যমান) তৈরি করা হারাম।"** (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৫৬)
---
### **২. প্রয়োজনে ফটোগ্রাফি জায়েজ হওয়ার শর্ত ও দলিল:**
হানাফি ফিকহে সাধারণ নিষেধ থাকলেও **"ḍarūrah" (অত্যাবশ্যক প্রয়োজন)**-এর ভিত্তিতে ছবি তোলাকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দলিল:
#### **ক. শরয়ী নীতি:**
আল্লাহ বলেন:
**﴿فَمَنِ اضْطُرَّ غَیْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَاۤ إِثْمَ عَلَیْهِ﴾** (সূরা বাকারা: ১৭৩)
**"যে ব্যক্তি বাধ্য হয়, অতিক্রম বা সীমালঙ্ঘন না করলে তার কোনো গুনাহ নেই।"**
#### **খ. হানাফি ফকিহদের ব্যাখ্যা:**
- ইমাম কাসানি (রহ.) **"বাদায়িউস সানায়ি"**-তে লিখেন:
**"إِذَا دَعَتِ الضَّرُورَةُ إِلَى التَّصْوِيرِ كَمَا لَوْ احْتِيجَ إِلَيْهِ لِلدَّلِيلِ عَلَى الْجُرْمِ أَوْ لِلتَّعْلِيمِ فَلَا حَرَجَ"**
**"প্রয়োজনে যেমন অপরাধ প্রমাণ বা শিক্ষার জন্য ছবি ব্যবহার জায়েজ।"** (বাদায়িউস সানায়ি: ৬/২৮৯)
- ফতোয়া-ই আলমগীরিতেও উল্লেখ রয়েছে:
**"إِنَّمَا یُبَاحُ التَّصْوِیرُ لِلدَّلِیلِ عَلَی الْجِنَایَةِ أَوْ لِلضَّرُورَةِ"**
**"অপরাধ প্রমাণ বা জরুরি প্রয়োজনে ছবি তোলা জায়েজ।"** (ফতোয়া-ই আলমগীরি: ৫/৩৩৬)
---
### **৩. আধুনিক হানাফি আলেমদের অভিমত:**
- **মুফতি তাকি উসমানি (দা.ব.)** বলেন:
**"التَّصْوِیرُ بِالْآلَةِ الْحَدِيثَةِ لَيْسَ تَصْوِيرًا مَنْهِيًّا عَنْهُ إِذَا لَمْ یَکُنْ فِیهِ تَمَاثِیلُ کَامِلَةٌ، وَیُبَاحُ لِلضَّرُورَةِ"**
**"আধুনিক ক্যামেরায় তোলা ছবি নিষিদ্ধ নয় যদি তা পূর্ণাঙ্গ প্রাণীর ছবি না হয়। প্রয়োজনে তা জায়েজ।"** (ইসলাম আওর জাদিদ মাসায়েল: ১/২৪৫)
- **দারুল উলুম দেওবন্দ**-এর ফতোয়া:
**"التَّصْوِیرُ لِلْحَاجَةِ مِثْلَ الْبَطَاقَةِ أَوِ الْجَوَازِ جَائِزٌ بِشَرْطِ اجْتِنَابِ التَّکَبُّرِ وَالْعُدْوَانِ"**
**"পাসপোর্ট বা আইডি কার্ডের মতো প্রয়োজনে ছবি তোলা জায়েজ, তবে অহংকার ও সীমালঙ্ঘন এড়িয়ে।"** (ফতোয়া দারুল উলুম: ৯/৩৪২)
---
### **৪. জায়েজ হওয়ার শর্তাবলি:**
১. **প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ ছবি এড়ানো:** মুখ বা আংশিক ছবি গ্রহণে নমনীয়তা।
২. **শরয়ী প্রয়োজন:** আইনি ডকুমেন্ট, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ইত্যাদি।
৩. **অহংকার ও গুনাহমুক্ত উদ্দেশ্য:** সোশ্যাল মিডিয়ায় অশালীন ব্যবহার না করা।
৪. **মূর্তি পূজা থেকে দূরত্ব:** ছবি যেন পূজার বস্তু না হয়।
---
### **৫. সর্বোত্তম পথ:**
হানাফি মাযহাবের মূলনীতি হলো **"الضَّرُورَاتُ تُبِيحُ الْمَحْظُورَاتِ"** (প্রয়োজনে নিষিদ্ধ জিনিস বৈধ)। তাই প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম না করে এবং আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য এড়িয়ে চলাই উত্তম।

