মদ বা মাদকদ্রব্য হারাম হওয়ার বিষয়টি ইসলামে ধাপে ধাপে নাজিল হয়েছে। এই আয়াতগুলো নাজিল হওয়ার পিছনে কিছু ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। নিম্নে মদ হারাম হওয়ার ব্যাপারে নাজিল হওয়া চারটি আয়াতের প্রেক্ষাপট ও ঘটনা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
### ১. প্রথম আয়াত: সূরা বাকারাহ (২:২১৯)
**প্রেক্ষাপট:**
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মদ পান করা সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল। আরব সমাজে মদ পান একটি সামাজিক রীতি হিসেবে বিবেচিত হতো। এমনকি কিছু সাহাবীও মদ পান করতেন। এই প্রেক্ষাপটে সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। তখন এই আয়াত নাজিল হয়।
**ঘটনা:**
একদিন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এবং মুআয ইবনে জাবাল (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলেন, "হে আল্লাহর রাসুল! মদ ও জুয়া সম্পর্কে আমাদের জন্য হুকুম কী? কারণ এগুলো আমাদের সম্পদ ও বুদ্ধি নষ্ট করে।" তখন এই আয়াত নাজিল হয়, যাতে মদ ও জুয়ার ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা হয়।
**আয়াত:**
﴿يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ ۖ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا ۗ وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ﴾
**অনুবাদ:**
"তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, এ দুটিতে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও। কিন্তু এগুলোর পাপ উপকারের চেয়ে অনেক বেশি। আর তারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে? বলুন, প্রয়োজন অতিরিক্ত। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর।"
**ব্যাখ্যা:**
এই আয়াতে মদ ও জুয়ার ক্ষতিকর দিকগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যদিও এতে কিছু সামাজিক বা অর্থনৈতিক উপকারিতা রয়েছে, তবে এর ক্ষতিকর দিকগুলো অনেক বেশি। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে মদ ও জুয়ার ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন করেন এবং তাদেরকে চিন্তা-ভাবনা করার আহ্বান জানান। এই আয়াতটি মদ হারাম হওয়ার দিকে প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
---
### ২. দ্বিতীয় আয়াত: সূরা নিসা (৪:৪৩)
**প্রেক্ষাপট:**
প্রথম আয়াত নাজিল হওয়ার পরও কিছু সাহাবী মদ পান করতে থাকেন। একদিন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর বাড়িতে কিছু সাহাবী মদ পান করেন এবং মাগরিবের সালাতের সময় ইমামতি করার জন্য একজনকে দাঁড় করানো হয়। কিন্তু নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তিনি সালাতের মধ্যে ভুল করে ফেলেন। তখন এই আয়াত নাজিল হয়।
**ঘটনা:**
একদিন সাহাবীদের একটি দল মদ পান করে মাগরিবের সালাতের জন্য দাঁড়ান। কিন্তু নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তারা সালাতের মধ্যে ভুল করে ফেলেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাজিল হয়।
**আয়াত:**
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنتُمْ سُكَارَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ وَلَا جُنُبًا إِلَّا عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّىٰ تَغْتَسِلُوا ۚ وَإِن كُنتُم مَّرْضَىٰ أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِّنكُم مِّنَ الْغَائِطِ أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًّا غَفُورًا﴾
**অনুবাদ:**
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে পারো যা তোমরা বলছ; আর সাফ না হওয়া অবস্থায়ও নয়, সফর অবস্থায় ছাড়া। আর যদি তোমরা অসুস্থ হও বা সফরে থাক অথবা তোমাদের মধ্যে কেউ পায়খানা থেকে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে মিলিত হও এবং পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর।"
**ব্যাখ্যা:**
এই আয়াতে মদ্যপানকারীদেরকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাত আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে। এখানে মদ্যপানের ফলে সৃষ্ট অজ্ঞানতা ও অসচেতনতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা সালাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। এই আয়াতের মাধ্যমে মদ্যপানের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে এবং এটি হারাম হওয়ার দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে যায়।
---
### ৩. তৃতীয় আয়াত: সূরা মায়িদাহ (৫:৯০)
**প্রেক্ষাপট:**
দ্বিতীয় আয়াত নাজিল হওয়ার পরও কিছু সাহাবী মদ পান করতে থাকেন। একদিন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) আল্লাহর কাছে দুআ করেন, "হে আল্লাহ! মদ সম্পর্কে আমাদের জন্য স্পষ্ট বিধান দান করুন।" তখন এই আয়াত নাজিল হয়।
**ঘটনা:**
একদিন উমর (রা.) আল্লাহর কাছে দুআ করেন, "হে আল্লাহ! মদ সম্পর্কে আমাদের জন্য স্পষ্ট বিধান দান করুন।" এর কিছুদিন পর এই আয়াত নাজিল হয়।
**আয়াত:**
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾
**অনুবাদ:**
"হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ধারক তীর সবই শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।"
**ব্যাখ্যা:**
এই আয়াতে মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ধারক তীরকে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং মুমিনদেরকে এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতটি মদ হারাম হওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট ও চূড়ান্ত ঘোষণা হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে মদকে শয়তানের কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে তা সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
---
### ৪. চতুর্থ আয়াত: সূরা মায়িদাহ (৫:৯১)
**প্রেক্ষাপট:**
তৃতীয় আয়াত নাজিল হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম মদ পান করা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করেন। এই আয়াতটি মদ হারাম হওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সতর্কতা হিসেবে নাজিল হয়।
**ঘটনা:**
সাহাবায়ে কেরাম মদ পান করা বর্জন করার পর এই আয়াত নাজিল হয়, যাতে শয়তানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক করা হয়।
**আয়াত:**
﴿إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ﴾
**অনুবাদ:**
"শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখতে। সুতরাং তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না?"
**ব্যাখ্যা:**
এই আয়াতে শয়তানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখতে চায়। এই আয়াতের মাধ্যমে মদ ও জুয়ার ক্ষতিকর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাবগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং মুমিনদেরকে এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
---
### উপসংহার:
মদ হারাম হওয়ার বিষয়টি ধাপে ধাপে নাজিল হয়েছে। প্রথমে এর ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে, তারপর নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাত আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে, এবং সর্বশেষে মদকে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে তা সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা ইসলামের আইন প্রণয়নের একটি সুন্দর উদাহরণ, যেখানে মানুষের মানসিকতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করে ধীরে ধীরে বিধান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

