ইয়াজুজ-মাজুজ কারা?

 ইয়াজুজ ও মাজুজ (গোগ ও ম্যাগগ) সম্পর্কে কুরআন, হাদিস ও ফিকহের কিতাবে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এরা একটি ধ্বংসাত্মক গোত্র, যা শেষ যামানায় পৃথিবীতে বিশাল ফিতনা সৃষ্টি করবে। নিম্নে তাদের পরিচয়, অবস্থান, আবির্ভাব ও ধ্বংস সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হলো:


### **১. ইয়াজুজ-মাজুজ কারা?**

ইয়াজুজ ও মাজুজ আদম (আ.)-এর সন্তান। তারা একটি বিশাল ও শক্তিশালী গোত্র, যারা পৃথিবীতে অশান্তি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। তাদের সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে বর্ণনা রয়েছে:


- **কুরআনে ইয়াজুজ-মাজুজ:**  

  সূরা আল-কাহফে আল্লাহ তাআলা বলেন:  

  > **"যুলকারনাইন যখন ইয়াজুজ-মাজুজের অত্যাচারে পৌঁছলেন, তখন তারা পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে তা দিয়ে শব্দ করে পানি পান করত।"** (সূরা আল-কাহফ ১৮:৯৩-৯৮)  


  সূরা আল-আম্বিয়ায় বলা হয়েছে:  

  > **"যতক্ষণ না ইয়াজুজ-মাজুজের বাঁধ খুলে দেওয়া হবে এবং তারা সব উচ্চস্থান থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসবে।"** (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৯৬)


- **হাদিসে বর্ণনা:**  

  নবী (ﷺ) বলেন:  

  > **"ইয়াজুজ-মাজুজ প্রতিদিন সেই বাঁধ খনন করে, এমনকি যখন তারা সূর্যের আলো দেখতে পায়, তখন তাদের নেতা বলে, 'চলো ফিরে যাই, আগামীকাল আমরা এটি শেষ করব।' কিন্তু আল্লাহ রাতে তা আবার পুনর্নির্মাণ করেন। অবশেষে যখন আল্লাহ চাইবেন, তারা বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসবে।"** (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৩৪৬)


### **২. ইয়াজুজ-মাজুজ কোথায় আছে?**

ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীর একটি দুর্গম স্থানে বন্দী অবস্থায় আছে। হাদিস ও তাফসিরে বর্ণিত হয়েছে:


- **যুলকারনাইনের বাঁধ:**  

  মহান রাজা যুলকারনাইন তাদের অত্যাচার থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য একটি লোহার প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন (সূরা আল-কাহফ ১৮:৯৬)। এটি সম্ভবত ককেশাস পর্বতমালার নিকটবর্তী কোনো স্থানে অবস্থিত।


- **আধুনিক ব্যাখ্যা:**  

  কিছু আলেম মনে করেন, এটি বর্তমান জর্জিয়া, আর্মেনিয়া বা রাশিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত। তবে এর সঠিক অবস্থান আল্লাহই ভালো জানেন।


### **৩. ইয়াজুজ-মাজুজ কিভাবে বের হবে?**

ইয়াজুজ-মাজুজ শেষ যামানায় বের হবে, যা কিয়ামতের বড় নিদর্শনগুলোর একটি:


- **বাঁধ ভেঙে বের হওয়া:**  

  হাদিসে এসেছে, তারা আল্লাহর আদেশে বাঁধ ভেঙে বের হবে এবং পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে।  

  > **"তারা পানি পান করে নদী-নালা শুষ্ক করে ফেলবে, মানুষ তাদের ভয়ে দূর্গে পালিয়ে যাবে।"** (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯৩৭)


- **ইমাম মাহদি ও ঈসা (আ.)-এর সময়:**  

  তারা ইমাম মাহদির যুগে বা ঈসা (আ.)-এর নেতৃত্বে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের সময় আবির্ভূত হবে।


### **৪. ইয়াজুজ-মাজুজ কিভাবে ধ্বংস হবে?**

ইয়াজুজ-মাজুজের ধ্বংস সম্পর্কে হাদিসে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে:


- **ঈসা (আ.)-এর দোয়া:**  

  তারা পৃথিবীতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর ঈসা (আ.) মুমিনদের নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন।  

  > **"আল্লাহ তাদের গর্দানে পোকা সৃষ্টি করবেন, ফলে সকাল হওয়ার আগেই তারা সবাই মারা যাবে।"** (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯৩৭)


- **পচন ও দুর্গন্ধ ছড়ানো:**  

  তাদের মৃতদেহে এমন দুর্গন্ধ ছড়াবে যে আল্লাহ বিশেষ পাখি পাঠিয়ে তাদের দেহ সমুদ্রে নিক্ষেপ করবেন।


### **৫. ফিকহের দৃষ্টিকোণ:**

ইয়াজুজ-মাজুজের ঘটনা ঈমানের অংশ, কেননা এটি কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এ সম্পর্কে বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব। তাদের আবির্ভাব কিয়ামতের নিশ্চিত আলামত, যা অদূর ভবিষ্যতে ঘটবে।


### **উপসংহার:**

ইয়াজুজ-মাজুজ একটি ভয়ঙ্কর জাতি, যাদের আবির্ভাব শেষ যামানায় হবে। তারা পৃথিবীতে বিশাল ধ্বংস সৃষ্টি করবে, কিন্তু আল্লাহর হুকুমে ঈসা (আ.)-এর দোয়ায় তারা ধ্বংস হবে। মুমিনদের উচিত এ সম্পর্কে জ্ঞান রাখা এবং আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়া।  


**সূত্র:**  

- সূরা আল-কাহফ (১৮:৯৩-৯৮), সূরা আল-আম্বিয়া (২১:৯৬)  

- সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৩৪৬  

- সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯৩৭  

- তাফসির ইবনে কাসির, তাবারি  


আল্লাহ আমাদের সবাইকে ফিতনা থেকে হিফাজত করুন। আমীন!

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!