**হানফি মাজহাব অনুযায়ী কোরবানির নিসাবের বিস্তারিত আলোচনা**
### **নিসাব কী?**
নিসাব হলো ইসলামি শরিয়তে নির্ধারিত সম্পদের একটি ন্যূনতম সীমা, যা অতিক্রম করলে নির্দিষ্ট ইবাদত (যেমন: যাকাত, কোরবানি) ওয়াজিব হয়। হানফি মাজহাব মতে, **কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকানা অপরিহার্য**।
---
### **নিসাবের পরিমাণ ও প্রকার**
হানফি ফিকহের বিধান অনুযায়ী নিসাবের পরিমাণ নিম্নরূপ:
১. **সোনা**: ৭.৫ তোলা (≈ ৮৭.৪৮ গ্রাম)।
২. **রূপা**: ৫২.৫ তোলা (≈ ৬১২.৩৬ গ্রাম)।
৩. **নগদ টাকা/বাণিজ্যিক পণ্য**: সোনা বা রূপার নিসাবের সমমূল্য (বর্তমান বাজারমূল্য অনুসারে)।
৪. **অন্যান্য সম্পদ**: বাড়তি জমি, গাড়ি, অলংকার (ব্যবহারিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত) ইত্যাদি।
**শর্ত**:
- সম্পদটি "প্রয়োজনাতিরিক্ত" হতে হবে (বাসস্থান, পোশাক, বুনিয়াদি সরঞ্জাম ইত্যাদি নিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়)।
- নিসাবের হিসাব **সোনা বা রূপার যেকোনো একটির মানদণ্ডে** করা যাবে (যেটি ব্যক্তির জন্য সুবিধাজনক)।
---
### **দলিল ও যুক্তি**
১. **কোরআন**:
> **সূরা আল-বাকারাহ ২৬৭**:
*"يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ..."*
**(অর্থ: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের উপার্জিত পবিত্র বস্তু থেকে দান করো...")**
*→ এ আয়াতে "প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ" থেকে দান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা নিসাবের ভিত্তি।*
২. **হাদিস**:
> **সহিহ বুখারি (১৪৫৮)**:
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, *"যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই, তার উপর যাকাত ফরজ নয়।"*
*→ হানফি উলামাগণ এ হাদিসকে কোরবানির নিসাবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য মনে করেন।*
> **সুনান আবু দাউদ (২৭৮৫)**:
*"কোরবানি শুধুমাত্র সেই ব্যক্তির উপর ওয়াজিব যে সামর্থ্যবান।"*
৩. **হানফি ফিকহের গ্রন্থ**:
- **আল-হিদায়া (১/৩২১)**:
*"কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিসাব হলো যাকাতের নিসাবের সমপরিমাণ সম্পদ।"*
- **ফাতাওয়া আলমগীরি (৫/২৯৭)**:
*"নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হয়, তা যাকাতের নিসাবের মতোই।"*
---
### **গুরুত্বপূর্ণ বিস্তারিত**
১. **সম্পদের স্থায়িত্ব**:
- যাকাতের নিসাবের বিপরীতে **কোরবানির নিসাবের জন্য সম্পদ এক বছর ধরে থাকা জরুরি নয়**। শুধু **ঈদের দিনগুলোতে (১০-১২ জিলহজ)** নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই কোরবানি ওয়াজিব হয়।
২. **সম্পদের প্রকার**:
- সোনা, রূপা, নগদ টাকা, বাণিজ্যিক পণ্য, পশু, অলংকার (ব্যবহারের অতিরিক্ত) সবই নিসাবের হিসাবে যোগ্য।
- **ঋণ**: যদি কারো কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে এবং ঋণ পরিশোধের পরও নিসাব টিকে থাকে, তাহলে কোরবানি ওয়াজিব।
৩. **পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব**:
- হানফি মতে, **প্রত্যেক নিসাব পরিমাণ সম্পদশালী প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের জন্য আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব**। পরিবারের প্রধান হিসেবে পিতার উপর সন্তানদের কোরবানি ওয়াজিব নয়।
৪. **নিসাবের হিসাব পদ্ধতি**:
- সোনা বা রূপার বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী নগদ টাকার নিসাব নির্ধারণ করা হয়।
- **উদাহরণ**: যদি ১ গ্রাম সোনার মূল্য ১০,০০০ টাকা হয়, তবে ৮৭.৪৮ গ্রাম সোনার মূল্য ≈ ৮,৭৪,৮০০ টাকা। এ পরিমাণ টাকা বা সম্পদ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব।
---
### **নিসাব সম্পর্কে সাধারণ ভুল ধারণা**
- **ভুল ১**: "যাকাত দিলে কোরবানির দায়িত্ব মুক্ত হয়।"
**সঠিক**: যাকাত ও কোরবানি পৃথক ইবাদত। উভয়ের নিসাব পৃথকভাবে বিবেচ্য।
- **ভুল ২**: "শুধু সোনা-রূপাই নিসাবের অন্তর্ভুক্ত।"
**সঠিক**: নগদ টাকা, বাণিজ্যিক পণ্য, অলংকারসহ সকল প্রকার সম্পদ নিসাবের হিসাবে যোগ্য।
---
### **মূলনীতি সংক্ষেপে**
- **নিসাব = সোনা ৭.৫ তোলা / রূপা ৫২.৫ তোলা / তার সমমূল্য**।
- **সময়**: ঈদের দিনে নিসাব থাকলেই কোরবানি ওয়াজিব।
- **দায়িত্ব**: প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য আলাদা কোরবানি।
**※ হানফি মাজহাবের ফিকহি রেফারেন্স**:
> **রদ্দুল মুহতার (৩/৫৬৭)**: *"নিসাবের ভিত্তি হলো যাকাতের নিসাবের সমতুল্য সম্পদ। ঈদের দিনে যার কাছে এ পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তার উপর কোরবানি ওয়াজিব।"*
---
**সারমর্ম**: হানফি মাজহাব মতে, কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য ঈদের দিনে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকানা আবশ্যক। নিসাবের পরিমাণ সোনা, রূপা বা তার সমমূল্যের সম্পদ দ্বারা নির্ধারিত হয়। এ বিধান কোরআন, হাদিস ও হানফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ দ্বারা সমর্থিত।**

