হজরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর জীবনী
📖 কুরআন ও হাদীসের আলোকে
পরিচিতি ও বংশ পরিচয়:
হজরত ইব্রাহিম (আঃ) হলেন ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত নবী। তাঁকে ﴿خَلِيلُ اللّٰهِ﴾ (খালীলুল্লাহ্ – আল্লাহর বন্ধু) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।
🔹 নাম: ইব্রাহিম (আঃ)
🔹 উপাধি: খালীলুল্লাহ (আল্লাহর বন্ধু)
🔹 বংশ: তিনি নূহ (আঃ)-এর পুত্র বংশধর
🔹 পিতা: আযার (বা তারেহ) – একজন মূর্তি পূজারী
🔹 জন্মস্থান: বাবিল/ইরাক
—
১. তাওহিদের প্রতি দাওয়াত ও মূর্তিপূজার প্রতিবাদ
ইব্রাহিম (আঃ)-এর যুগে মানুষ সূর্য, চাঁদ, তারা ও মূর্তি পূজা করত। আল্লাহ তাঁকে প্রেরণ করেন তাওহিদের দাওয়াত দিতে।
📖 কুরআন:
﴿وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً إِنِّي أَرَاكَ وَقَوْمَكَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ﴾
— সূরা আল-আন’আম: ৭৪
🔸 অর্থ: "ইব্রাহিম যখন তার পিতা আযারকে বলেছিল, ‘তুমি কি মূর্তিকে উপাস্য করে নিলে? আমি তো তোমাকে ও তোমার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি।’"
তিনি সূর্য-চন্দ্র-তারার উপাসনার বিরুদ্ধেও যুক্তি দেন (সূরা আনআম ৭৬–৭৯) এবং শেষ পর্যন্ত ঘোষণা করেন:
📖
﴿إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا﴾
— সূরা আন’আম: ৭৯
অর্থ: “আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখ ফিরিয়েছি আসমান ও জমিনের সৃষ্টিকর্তার দিকে।”
—
২. মূর্তি ভাঙা ও আগুনে নিক্ষেপ
হজরত ইব্রাহিম (আঃ) একবার মূর্তির মন্দিরে সব মূর্তি ভেঙে দেন এবং বড় মূর্তির গলায় কুড়াল ঝুলিয়ে রাখেন।
📖 সূরা আল-আন্বিয়া: ৫১–৭০
﴿قَالَ بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هَـٰذَا﴾
— অর্থ: “তিনি বললেন, এটা তো করেছে এই বড় মূর্তিটি! যদি তারা কথা বলতে পারে, তবে তাকে জিজ্ঞাসা কর।”
তারপর রাজা নমরুদের নির্দেশে তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু আল্লাহ বলেন:
📖
﴿قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ﴾
— সূরা আল-আন্বিয়া: ৬৯
অর্থ: “হে আগুন! তুমি ইব্রাহিমের ওপর শান্তি ও শীতল হয়ে যাও।”
—
৩. নমরুদের সাথে বিতর্ক
নমরুদ দাবি করত যে, সে জীবন-মরণ দিতে পারে। ইব্রাহিম (আঃ) যুক্তি দেখান:
📖 সূরা আল-বাকারা: ২৫৮
﴿إِبْرَاهِيمَ قَالَ فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ﴾
অর্থ: “ইব্রাহিম বললেন, আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি তা পশ্চিম থেকে উদিত করো।”
এতে নমরুদ অবাক ও পরাজিত হয়ে যায়।
—
৪. আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস
হজরত ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহর কাছে জিজ্ঞেস করেন, কীভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন।
📖 সূরা আল-বাকারা: ২৬০
﴿قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَىٰ وَلَـٰكِن لِّيَطْمَئِنَّ قَلْبِي﴾
অর্থ: “(আল্লাহ) বললেন: তুমি কি ঈমান করোনি? ইব্রাহিম বললেন: হ্যাঁ, তবে আমি চাই আমার অন্তর শান্ত হোক।”
আল্লাহ তাকে নির্দেশ দেন ৪টি পাখি নিয়ে কেটে টুকরো করে চার পাহাড়ে রাখার, পরে তাদের ডাকলে জীবিত হয়ে ফিরে আসে — এটি আল্লাহর কুদরতের প্রমাণ।
—
৫. সন্তান লাভ ও কুরবানির আদেশ
দীর্ঘদিন সন্তানহীন থাকার পর ইব্রাহিম (আঃ)-এর স্ত্রী হাজেরা থেকে জন্ম হয় ইসমাঈল (আঃ)-এর।
আল্লাহ তাঁকে আদেশ করেন:
📖
﴿فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَىٰ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ﴾
— সূরা আস-সাফফাত: ১০২
অর্থ: “তিনি বললেন, হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে কুরবানি করছি...”
ইসমাঈল (আঃ) রাজি হন। যখন কুরবানি করতে যান, আল্লাহ তা প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেন এবং একটি দুম্বা পাঠান।
—
৬. কাবা নির্মাণ
ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) কাবা শরীফ নির্মাণ করেন।
📖 সূরা আল-বাকারা: ১২৭
﴿وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ﴾
অর্থ: “যখন ইব্রাহিম ও ইসমাঈল কাবার ভিত্তি উত্তোলন করছিলেন...”
তাঁরা দোআ করেন:
﴿رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ﴾
—
৭. তাঁর স্ত্রী সারাহ ও ইসহাক (আঃ)
দীর্ঘ সময় পর তার স্ত্রী সারাহর গর্ভে জন্ম হয় দ্বিতীয় পুত্র ইসহাক (আঃ)-এর।
📖 সূরা হুদ: ৭১
﴿فَبَشَّرْنَاهَا بِإِسْحَاقَ وَمِن وَرَاءِ إِسْحَاقَ يَعْقُوبَ﴾
অর্থ: “আমরা তাকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের, এবং ইসহাকের পরে ইয়াকুবের।”
—
৮. তাঁর মৃত্যু
ইব্রাহিম (আঃ)-এর মৃত্যু হয় উচ্চ বয়সে। কুরআন জানায়:
📖 সূরা আন-নাহল: ১২০
﴿إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِّلَّـهِ﴾
অর্থ: “নিশ্চয়ই ইব্রাহিম ছিলেন একটি জাতির সমান, আল্লাহর একনিষ্ঠ অনুগত।”
—
৯. হাদীসে প্রশংসা
রাসূল (ﷺ) বলেন:
❝তোমাদের সবার চেয়ে প্রিয় ব্যক্তি ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন, তিনি আল্লাহর খালিল (প্রিয়তম বন্ধু) ছিলেন।❞
— সহিহ মুসলিম
—
১০. উম্মতে মুসলিমাহর জন্য শিক্ষণীয় বিষয়:
-
তাওহিদের প্রতি অটল থাকা
-
শিরকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
-
সন্তানসহ আল্লাহর আদেশে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ
-
দান, ত্যাগ ও ইবাদতের উচ্চতম নমুনা
—
📌 উপসংহার:
হজরত ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন তাওহিদের ঝাণ্ডাবাহক, তাঁর জীবন ছিল ঈমান, ত্যাগ, দাওয়াত, কুরবানি ও ইবাদতের অনন্য উদাহরণ। ইসলামে তাঁর স্থায়ী স্মৃতি হলো হজ, কুরবানি ও কাবা শরীফ।
আল্লাহ আমাদের তাঁর মতো ঈমান ও ত্যাগের গুণে গুণান্বিত করুন — আমিন।
