**সন্তানের প্রতি পিতামাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য : কুরআন, হাদিস ও ফিকহের আলোকে বিশদ আলোচনা**
পিতামাতার দায়িত্ব শুধু সন্তানের শারীরিক লালন-পালন নয়, বরং তাদের **ঈমান, আখলাক ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে** গড়ে তোলা। নিম্নে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
---
## **১. সন্তানের অধিকার ও পিতামাতার দায়িত্ব : কুরআন ও হাদিসের দলিল**
### **(ক) সন্তানের নাম রাখা ও আকিকা দেওয়া**
- **নাম রাখা**:
- উত্তম নাম রাখা **ওয়াজিব** (যেমন: আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান)।
- **হাদিস**:
> রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, _"কিয়ামতের দিন তোমাদের নাম ও তোমাদের পিতার নামে ডাকা হবে, তাই তোমাদের নাম ভালো রাখো।"_
> **(সুনানে আবু দাউদ, ৪৯৪৮)**
- **আকিকা দেওয়া**:
- জন্মের ৭ম দিনে **২টি ছাগল (ছেলে সন্তানের জন্য)** ও **১টি ছাগল (মেয়ে সন্তানের জন্য)** জবেহ করা সুন্নত।
- **হাদিস**:
> সালমান ইবনে আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, _"সন্তানের সাথে আকিকার সম্পর্ক আছে, তাই তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত করো (জবেহ করো) এবং তার থেকে কষ্ট দূর করো (মাথার চুল কেটে দাও)।"_
> **(সহিহ বুখারী, ৫৪৭২)**
---
### **(খ) সন্তানের উত্তম লালন-পালন ও শিক্ষাদান**
#### **১. ঈমান ও আকিদার শিক্ষা দেওয়া**
- **সহিহ তাওহিদ ও রিসালাতের শিক্ষা** দেওয়া পিতামাতার দায়িত্ব।
- **কুরআন**:
> **"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও..."**
> **(সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬)**
#### **২. নামাজ ও ইবাদতের প্রশিক্ষণ**
- **৭ বছর বয়স থেকে নামাজের নির্দেশ** দেওয়া এবং **১০ বছর বয়সে শাস্তির ব্যবস্থা** করা (যদি নামাজ ছেড়ে দেয়)।
- **হাদিস**:
> রাসূল (সা.) বলেছেন,
> _"তোমরা সন্তানদেরকে নামাজের আদেশ দাও যখন তারা সাত বছরে উপনীত হয়, আর দশ বছর বয়সে (যদি নামাজ না পড়ে) তখন তাদের প্রহার করো এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।"_
> **(সুনানে আবু দাউদ, ৪৯৫)**
#### **৩. নৈতিকতা ও আদব-কায়দা শেখানো**
- **সত্যবাদিতা, আমানতদারী ও সম্মানজনক আচরণ** শেখানো।
- **হাদিস**:
> রাসূল (সা.) বলেছেন,
> _"পিতা-মাতা সন্তানকে উত্তম আদব-কায়দা শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে সর্বোত্তম যে উপহার দিতে পারে, তার চেয়ে উত্তম কোনো উপহার নেই।"_
> **(তিরমিজি, ১৯৫২)**
#### **৪. কুরআন-হাদিস ও দুনিয়াবি শিক্ষা দেওয়া**
- **ইলমে দ্বীন ও প্রয়োজনীয় দুনিয়াবি জ্ঞান** দেওয়া।
- **হাদিস**:
> ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন,
> _"জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ।"_
> **(ইবনে মাজাহ, ২২৪)**
---
## **২. সন্তানের ভরণ-পোষণ ও আর্থিক দায়িত্ব**
- সন্তানের **খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষার ব্যয়ভার** বহন করা পিতার উপর **ওয়াজিব**।
- **কুরআন**:
> **"আর সন্তানের পিতাই তাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্বশীল।"**
> **(সূরা আল-বাকারা ২:২৩৩)**
- **মায়ের দায়িত্ব**:
- দুধ পান করানো (যদি সম্ভব হয়) এবং স্নেহ-মমতা দিয়ে লালন-পালন করা।
---
## **৩. সন্তানের প্রতি অবহেলা ও কু-শিক্ষার পরিণাম**
### **(ক) সন্তানকে গুনাহের দিকে ঠেলে দেওয়া হারাম**
- **হাদিস**:
> রাসূল (সা.) বলেছেন,
> _"তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে... পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল এবং তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে।"_
> **(সহিহ বুখারী, ৫২০০)**
### **(খ) সন্তানকে জাহান্নামের কারণ হওয়া থেকে বাঁচানো**
- **হাদিস**:
> _"যে ব্যক্তি তার সন্তানকে ভালো কাজের আদেশ করলো না, সে তার সন্তানের প্রতি জুলুম করলো।"_
> **(মুসনাদে আহমাদ, ১৪৪০৭)**
---
## **৪. ফিকহি গ্রন্থে উল্লিখিত দায়িত্বসমূহ (হানাফি মাজহাব)**
- **ফাতাওয়া আলমগিরি (১/৫৪৫)**:
- সন্তানের **ভরণ-পোষণ, শিক্ষা-দীক্ষা ও বিবাহের ব্যবস্থা** করা পিতার দায়িত্ব।
- **রদ্দুল মুহতার (৩/৬২১)**:
- সন্তানকে **গুনাহ থেকে বিরত রাখা** এবং **হালাল রুজির ব্যবস্থা** করা আবশ্যক।
---
## **৫. বাস্তব পরামর্শ : কিভাবে সন্তানকে মানুষ করতে হয়?**
1. **শিশুকাল থেকেই ইসলামি পরিবেশ দেওয়া** (আযান, কুরআন তিলাওয়াত শোনানো)।
2. **নেককার বন্ধু ও পরিবেশ নির্বাচন** করা।
3. **উদাহরণ সৃষ্টিকারী পিতামাতা হওয়া** (সন্তান অনুকরণ করে, তাই নিজেদের আচরণ সংশোধন করা)।
4. **সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক** গড়ে তোলা।
5. **দোয়া করা**:
- যেমন, ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া:
> **"হে আমার রব! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানাও এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও।"**
> **(সূরা ইবরাহিম ১৪:৪০)**
---
### **সর্বোপরি,**
পিতামাতার দায়িত্ব হলো সন্তানকে **আল্লাহভীরু, জ্ঞানী ও সমাজের উপকারী সদস্য** হিসেবে গড়ে তোলা। এটাই ইসলামের নির্দেশনা এবং কিয়ামতের দিন পিতামাতাকে এ বিষয়েই জবাবদিহি করতে হবে।
**আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সন্তান লালন-পালনের তাওফিক দান করুন। আমীন।**
---
**সূত্র**:
- কুরআনুল কারিম
- সহিহ বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি
- ফাতাওয়া আলমগিরি (হানাফি ফিকহ)
- রদ্দুল মুহতার (ইমাম শামী)

