তালাক (طلاق) কাহাকে বলে?

 

হানাফি মাজহাব মতে তালাক প্রদানের সঠিক ধাপ ও নিয়ম (ধাপে ধাপে গাইডলাইন)

ইসলামে তালাককে শেষ সমাধান হিসেবে দেখা হয়। তাই আগে সালিশ, পরামর্শ ও পরিবার-আদালতের চেষ্টা করা উচিত। যদি সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী সঠিকভাবে তালাক দেওয়ার নিয়ম নিচে তুলে ধরা হলো:


ধাপ – ১ : তালাক দেওয়ার আগে সতর্কতা ও পরামর্শ

  1. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে প্রথমে নসিহত (উপদেশ) দিতে হবে।
    📖 প্রমাণ:
    ﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِٱلْمَعْرُوفِ﴾
    “তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করো।” (সূরা আন-নিসা 4:19)

  2. যদি না মেনে চলে, তবে শয্যায় আলাদা করা

  3. তাও ফলপ্রসূ না হলে, হালকা মারধর (অত্যাচার নয়, কেবল সতর্ক করার মতো)(সূরা আন-নিসা 4:34)

  4. এর পরও যদি সমস্যা সমাধান না হয়, তখন দুই পক্ষের পরিবারের সালিশ বসাতে হবে। (সূরা আন-নিসা 4:35)

👉 এত প্রচেষ্টার পরও যদি মিলন সম্ভব না হয়, তবে তালাক দেওয়া বৈধ।


ধাপ – ২ : তালাক দেওয়ার সময় নির্বাচন

  • স্ত্রী হায়েয (মাসিক) অবস্থায় থাকলে তালাক দেওয়া যাবে না।

  • মাসিক শেষে পবিত্র অবস্থায় (তুহর), তবে শারীরিক সম্পর্ক না হলে তালাক দেওয়া যাবে।

  • এটি সুন্নতী তালাক (আহসান পদ্ধতি)

📖 হাদিস:
ইবনে উমর (রাঃ) স্ত্রীর মাসিক অবস্থায় তালাক দেন। রাসূল ﷺ বলেন:
“তাকে ফিরিয়ে নাও, তারপর পবিত্র অবস্থায় সহবাসের আগে চাইলে তালাক দাও।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস 1471)


ধাপ – ৩ : তালাকের সঠিক উচ্চারণ / ঘোষণা

তালাকের জন্য স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করতে হবে।

  • উদাহরণ: “আমি তোমাকে তালাক দিলাম” / “তুমি তালাকপ্রাপ্ত” ইত্যাদি।

👉 এভাবে একবারে একটি তালাক উচ্চারণ করতে হবে।


ধাপ – ৪ : ইদ্দত পালন

  1. তালাকের পর স্ত্রীকে ইদ্দত (৩ হায়েয / ৩ মাস) পালন করতে হবে।

  2. ইদ্দতের সময় স্ত্রী স্বামীর ঘরেই থাকবে, বাইরে বের হতে পারবে না (অপরিহার্য প্রয়োজনে ছাড়া)।

  3. ইদ্দতের মধ্যে স্বামী চাইলে রাজঈ (رجعي) তালাকের ক্ষেত্রে পুনরায় স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবে, নতুন মহর বা নতুন চুক্তি ছাড়াই।

📖 কুরআন:
﴿وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِى ذَٰلِكَ إِنْ أَرَادُوٓا۟ إِصْلَـٰحًۭا﴾
“ইদ্দতের মধ্যে তাদের স্বামীরা চাইলে পুনরায় তাদের ফিরিয়ে নিতে অধিক হকদার, যদি তারা মীমাংসা করতে চায়।”
(সূরা আল-বাকারাহ 2:228)


ধাপ – ৫ : দ্বিতীয় ও তৃতীয় তালাক (যদি প্রয়োজন হয়)

  1. প্রথম তালাক দেওয়ার পর ইদ্দত শেষ হলে যদি স্ত্রীকে না ফেরানো হয়, তবে সে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যাবে।

  2. এরপর আবার চাইলে নতুন করে নিকাহ হতে পারে।

  3. দ্বিতীয়বার নিকাহ করে আবার যদি তালাক দিতে হয়, তবে একই নিয়মে এক তালাক দিতে হবে।

  4. এভাবে সর্বোচ্চ তিনবার তালাক দেওয়া হলে (তালাক-এ-বাইন কুবরা), স্ত্রী আর ফিরতে পারবে না।
    তাকে অন্য স্বামীকে বিয়ে করতে হবে, সহবাস করতে হবে, তারপর বৈধভাবে তালাকপ্রাপ্ত হলে তবেই আগের স্বামীর সাথে পুনরায় নিকাহ সম্ভব।

📖 কুরআন:
﴿فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُۥ مِنۢ بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًۭا غَيْرَهُۥ﴾
“যদি সে তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে।”
(সূরা আল-বাকারাহ 2:230)


ধাপ – ৬ : তালাকের দলিল লিখন

  • তালাকের সময় সাক্ষী রাখা উত্তম (হানাফি মতে বাধ্যতামূলক নয়, তবে মাসলাহত)।

  • বর্তমানে আদালত/নোটারি/ইসলামী কোর্টে দলিল লিখে রাখা প্রয়োজন, যেন ভবিষ্যতে প্রমাণ থাকে।


🔑 সংক্ষেপে তালাক প্রদানের সঠিক ধাপ (হানাফি মতে):

  1. প্রথমে মিল-মিশ ও সালিশের চেষ্টা করা।

  2. স্ত্রী মাসিক শেষ করে পবিত্র অবস্থায় থাকলে, সহবাসের আগে একটি তালাক দেওয়া।

  3. স্ত্রী ইদ্দত পালন করবে (৩ মাসিক/৩ মাস)।

  4. ইদ্দতের মধ্যে চাইলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে।

  5. যদি না ফেরানো হয়, ইদ্দতের পর স্ত্রী আলাদা হয়ে যাবে।

  6. তিনবার তালাক পূর্ণ হলে স্ত্রী স্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যাবে, যতক্ষণ না হালালা (অন্য স্বামীর সাথে প্রকৃত বিবাহ-সহবাস-তালাক) না ঘটে।



তালাক (طلاق) কাহাকে বলে?

তালাক অর্থ বিচ্ছেদ বা মুক্তি দেওয়া। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়, স্বামী কর্তৃক বৈধ ও শরীয়ত-সম্মত পদ্ধতিতে স্ত্রীকে বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করার নাম হলো “তালাক”

➡️ কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন –
﴿ٱلطَّلَـٰقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَاكٌۢ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌۢ بِإِحْسَـٰنٍۗ﴾
অর্থ: “তালাক (ফেরাবার) দুটি সুযোগ রয়েছে, এর পর (স্ত্রীকে) হয় সুন্দরভাবে রেখে দাও অথবা সুন্দরভাবে বিদায় দাও।”
(সূরা আল-বাকারাহ 2:229)

➡️ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ
অর্থ: “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল জিনিস হলো তালাক।”
(সুনান আবু দাউদ, হাদিস 2178, সহিহ)


তালাক কয় প্রকার?

ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী তালাক প্রধানত তিন প্রকারে বিভক্ত:

১. তালাক-এ-সুন্নী (তালাক-এ-আহসান ও তালাক-এ-হাসান)

যে তালাক কুরআন-হাদিসে বর্ণিত সুন্নত অনুযায়ী প্রদান করা হয়।

  • তালাক-এ-আহসান (الأحسن):
    স্ত্রীকে একটি তালাক দেওয়া, ইদ্দতকাল পর্যন্ত তাকে আলাদা রাখা এবং পুনরায় স্পর্শ না করা।
    ➝ এটিকে সবচেয়ে উত্তম বলা হয়েছে।

    📖 প্রমাণ:
    আল্লাহ বলেন –
    ﴿فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا۟ ٱلْعِدَّةَ﴾
    অর্থ: “তোমরা স্ত্রীদের ইদ্দতের সময় তালাক দাও এবং ইদ্দত হিসাব করো।”
    (সূরা আত-তালাক 65:1)

  • তালাক-এ-হাসান (الحسن):
    ধারাবাহিকভাবে তিন মাসিক পবিত্রতার (তুহর) সময়ে একবার করে তালাক দেওয়া।


২. তালাক-এ-বিদআত (তালাক-এ-বিদ’ঈ / তালাক-এ-হারাম)

একসাথে তিন তালাক দেওয়া অথবা হায়েয (ঋতুমতী অবস্থায়) তালাক দেওয়া। এটি শরীয়ত বিরোধী (বিদআত), তবে কার্যকর হয়ে যায়।

📖 হাদিস প্রমাণ:
ইবনে উমর (রাঃ) বলেন:
তিনি স্ত্রীর হায়েয অবস্থায় তালাক দেন। রাসূল ﷺ বলেন:
مُرْهُ فَلْيُرَاجِعْهَا ثُمَّ لِيُمْسِكْهَا حَتَّى تَطْهُرَ ثُمَّ تَحِيضَ ثُمَّ تَطْهُرَ فَإِنْ شَاءَ أَمْسَكَ بَعْدُ وَإِنْ شَاءَ طَلَّقَ قَبْلَ أَنْ يَمَسَّ
অর্থ: “তাকে বলো স্ত্রীকে ফেরত নিতে, তারপর পবিত্র হলে চাইলে রেখে দেবে বা চাইলে সহবাসের আগে তালাক দিতে পারবে।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস 1471)


৩. তালাক-এ-বাইন (تَطْلِيقٌ بَائِنٌ)

এ তালাকে স্ত্রী স্বামী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আবার নতুন মহর দিয়ে পুনরায় বিবাহ না করলে সম্পর্ক ফিরে আসে না।

  • বাইন সুগরা (ছোট বাইন): ইদ্দতের মধ্যে পুনঃবিবাহ করা সম্ভব।

  • বাইন কুবরা (বড় বাইন / তিন তালাক): তিন তালাক পূর্ণ হলে পুনঃবিবাহ বৈধ নয়, যতক্ষণ না স্ত্রী অন্য স্বামীকে বিবাহ করে, সহবাস করে এবং বৈধভাবে তালাকপ্রাপ্ত হয়।

📖 প্রমাণ:
﴿فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُۥ مِنۢ بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًۭا غَيْرَهُۥ﴾
অর্থ: “যদি স্বামী তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য বৈধ হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে।”
(সূরা আল-বাকারাহ 2:230)


সংক্ষেপে তালাকের প্রকারভেদ (ফিকহ অনুযায়ী):

  1. সুন্নতী তালাক

    • আহসান (সবচেয়ে উত্তম)

    • হাসান (ভালো)

  2. বিদআতী তালাক (একসাথে ৩ তালাক বা হায়েয অবস্থায় তালাক)

  3. রেজ়ঈ তালাক (ইদ্দতের মধ্যে স্বামী স্ত্রীকে ফেরত নিতে পারে)

  4. বাইন তালাক

    • বাইন সুগরা

    • বাইন কুবরা (তিন তালাক)


উপসংহার:
ইসলামে তালাককে শেষ সমাধান হিসেবে দেখা হয়। অকারণে তালাক দেওয়া নিষিদ্ধ ও নিন্দনীয়। তবে প্রয়োজনে শরীয়ত অনুসারে দিলে বৈধ। সুন্নতী পদ্ধতিতে তালাক দিলে পুনর্মিলনের সুযোগ থাকে, আর বিদআতী তালাক শরীয়তের দৃষ্টিতে গোনাহ হলেও কার্যকর হয়ে যায়।



Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!