অন্যের জমিন দখল করা ইসলামে জায়েয কি?
ইসলামে অন্যের হক নষ্ট করা, জমি-জমা দখল করা বা কারো সম্পত্তি অন্যায়ভাবে ভোগ করা সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। কুরআন, হাদীস ও ফিকহে এ সম্পর্কে স্পষ্ট দলিল আছে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
🕌 কুরআনের দলিল
🔹 আল্লাহ تعالى বলেন –
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ
“তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, আর তা বিচারকদের নিকট পৌঁছে দিয়ো না যেন তোমরা মানুষের ধন-সম্পদের কিছু অংশ পাপাচার দ্বারা ভক্ষণ করতে পারো, অথচ তোমরা জানো।”
(সুরা আল-বাকারাহ 2:188)
🔹 আরেক স্থানে বলেন –
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
“আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয়, তারা তো এক মহা অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহর বোঝা বহন করল।”
(সুরা আল-আহযাব 33:58)
➡️ অর্থাৎ, অন্যায়ভাবে জমি দখল করা মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করার শামিল, যা আল্লাহ হারাম করেছেন।
🕌 হাদীসের দলিল
১. অন্যের জমি দখলের বিরুদ্ধে কঠিন হুঁশিয়ারি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ أَخَذَ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ ظُلْمًا طَوَّقَهُ اللَّهُ إِيَّاهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ
“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমি দখল করে, কিয়ামতের দিনে তাকে সাত স্তর জমির বোঝা তার গলায় চাপানো হবে।”
(সহিহ বুখারী 2452, সহিহ মুসলিম 1610)
২. জমি নিয়ে ঝগড়া ও হক নষ্টকারীর শাস্তি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنِ اقْتَطَعَ حَقَّ امْرِئٍ مُسْلِمٍ بِيَمِينِهِ، فَقَدْ أَوْجَبَ اللَّهُ لَهُ النَّارَ وَحَرَّمَ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ
সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, “যদি তা সামান্য কিছুই হয়?”
নবী ﷺ বললেন: وَإِنْ قَضِيبًا مِنْ أَرَاكٍ
“হ্যাঁ, এমনকি তা যদি একটি দাঁত খিলি (কাঠি) হলেও।”
(সহিহ মুসলিম 138)
➡️ অর্থাৎ সামান্য জমি হোক বা বড় জমি – দখল করা মারাত্মক গুনাহ।
🕌 ফিকহের আলোকে
হানাফি, মালিকি, শাফিঈ ও হাম্বলি চার মাযহাবের ফকিহগণ একমত যে:
-
অন্যের জমি বা সম্পত্তি অন্যায়ভাবে দখল করা হারাম ও কবিরা গুনাহ।
-
দখলকৃত জমি ফেরত দিতে হবে।
-
এর মাঝে যদি কোনো ইমারত বা ফসল জন্মে, তবে মালিকের অনুমতি ছাড়া দখলদারের কোনো অধিকার থাকবে না।
-
যদি দখলদার ফসল পেয়ে থাকে, তবে মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
🔹 ফিকহুল ইসলামী (ড. ওয়াহবা যুহাইলি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৫২):
“إغتصاب الأرض من الكبائر، ويجب ردّها لصاحبها، وضمان ما ترتب عليها من منافع.”
“জমি দখল করা কবিরা গুনাহ; জমি মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং এর দ্বারা যে উপকার হয়েছে তারও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।”
🕌 উপসংহার
অতএব, অন্যের জমি দখল করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম, জায়েয নয়।
👉 কুরআন এ কাজকে অন্যায় সম্পদ ভক্ষণ বলে অভিহিত করেছে।
👉 হাদীসে বলা হয়েছে, এমন ব্যক্তি কিয়ামতে সাত জমিনের বোঝা গলায় নেবে এবং জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে।
👉 ফিকহেও এটিকে কবিরা গুনাহ বলা হয়েছে এবং দখলকৃত জমি ফেরত দেওয়া ফরজ করা হয়েছে।
📌 তাই একজন মুসলিমের জন্য জমি দখল, অন্যায়ভাবে ভোগ বা কারো হক নষ্ট করা মারাত্মক গুনাহ ও জাহান্নামের কারণ।
🕌 হানাফি ফিকহ অনুযায়ী অন্যের জমি দখলের হুকুম ও ক্ষতিপূরণ
হানাফি মাযহাবের আলেমগণ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, অন্যের জমি দখল করা কবিরা গুনাহ, দখলদারকে জমি ফেরত দিতে হবে এবং মালিকের ক্ষতির ক্ষতিপূরণও দিতে হবে।
এখন ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা দিচ্ছি:
১. দখল করা জমি ফেরত দেওয়া ফরজ
-
দখলদার যদি জমিতে ঘর, দালান, বাগান বা ফসল লাগিয়ে থাকে, সব কিছুর মালিক আসল মালিকই হবে।
-
দখলদারের খরচ (যেমন বাড়ি বানানো, গাছ লাগানো ইত্যাদি) মালিক চাইলে ক্ষতিপূরণ দিয়ে রাখতে পারেন, অথবা চাইলে দখলদারকে জিনিস সরিয়ে জমি খালি করতে বলবেন।
📖 হিদায়া, কিতাবুল গাস্ব্ব (হানাফি ফিকহ):
“المغصوب يجب ردّه على صاحبه عينًا، فإن تعذّر فقيمته.”
“দখলকৃত জিনিস (জমিসহ) মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া ফরজ; যদি তা ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয় তবে এর মূল্য দিতে হবে।”
২. জমি থেকে অর্জিত ফসল বা লাভ
-
জমি দখলদার যে সময় দখলে রেখেছে, সে সময়ের উপকার/ফসল মূল মালিকের অধিকার।
-
দখলদার যদি ফসল বিক্রি করে খেয়ে ফেলে, তবে তার দাম মালিককে ফেরত দিতে হবে।
📖 الدر المختار (হানাফি ফিকহ):
“يضمن الغاصب منافع المغصوب مطلقًا، سواء استوفاها أو لم يستوفها.”
“দখলদার সব অবস্থায় দখলকৃত সম্পদের লাভ/উপকারের গ্যারান্টি বহন করবে – সে তা ভোগ করুক বা না করুক।”
৩. জমি নষ্ট হলে বা নষ্ট করে দিলে
-
যদি দখলদার জমি নষ্ট করে (যেমন: খনন করে অন্য কাজে ব্যবহার করে), তবে তাকে জমি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে।
-
যদি সম্ভব না হয় তবে বাজারমূল্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
📖 فتاوى عالمگيرى (আল-فتاوى الهندية, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৮৪):
“إذا غصب أرضًا وزرعها فعليه أجر المثل، والزرع لصاحب البذر.”
“যদি কেউ জমি দখল করে তাতে ফসল ফলায়, তবে জমির ভাড়ার সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেবে, আর ফসল হবে বীজের মালিকের।”
৪. দখলদারের গুনাহ মাফের উপায়
-
কেবল জমি ফেরত দেওয়া যথেষ্ট নয়।
-
তাকে তাওবা করতে হবে, কারণ জমি দখল করা কবিরা গুনাহ।
-
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং মালিকের সন্তুষ্টি আদায় করতে হবে।
📖 সহিহ বুখারী ও মুসলিমে নবী ﷺ বলেছেন:
مَنْ أَخَذَ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ ظُلْمًا طَوَّقَهُ اللَّهُ إِيَّاهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ
“যে অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমি দখল করে, কিয়ামতের দিন তাকে সাত স্তর জমিনের বোঝা গলায় চাপানো হবে।”
✅ ধাপে ধাপে সমাধান (হানাফি মতে)
-
দখলকৃত জমি ফিরিয়ে দেওয়া।
-
দখলের সময়ের ভাড়া/উপকার ফেরত দেওয়া।
-
যদি ফসল পাওয়া যায়, মালিকের হাতে তুলে দেওয়া।
-
যদি ফসল খেয়ে ফেলে, তার দাম ফেরত দেওয়া।
-
যদি বাড়ি-ঘর বানানো থাকে, মালিক চাইলে রেখে ক্ষতিপূরণ দিবে, না চাইলে ভেঙে সরাতে বলবে।
-
যদি জমি নষ্ট করে ফেলে, বাজারমূল্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
-
শেষে দখলদারকে আন্তরিক তাওবা করতে হবে।
👉 এভাবে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী অন্যের জমি দখলের ক্ষতিপূরণ ও সমাধান নির্ধারিত হয়েছে।
